শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৯ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আমার রাজশাহী
৫২

সেলাই মেশিনেই চল্লিশ বছর পার সাইফুল ইসলামের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২০  

 জীবন তো চলবেই জীবনের মতো ! তবে জীবনের মান চলমান রাখতে বিভিন্ন জন বেছে নিচ্ছেন বিচিত্র পেশা। কারন, জীবনের ভার বহন করতে জীবিকা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। কেউ ছোটবেলা তো কেউ বড় হয়ে, সবাইকেই কোনো না কোনো পেশার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতেই হয়। যার যার সুবিধা মত তারা প্রতিনিয়তই জীবিকার সাথে জীবনের সন্ধি স্থাপন করছেন। আর এ জন্যই জীবনের প্রয়োজনে জীবিকার সন্ধানে সবাই জীবন নামক যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করে আজীবন।

এমনি সদিচ্ছা সম্পন্ন জীবন যুদ্ধের এক সফল সৈনিক সাইফুল ইসলাম। বয়স ৭২ পেরিয়েছে। উজ্জল শ্যামবর্ণ চেহারার হালকা-পাতলা দৈহিক গঠন। মুখে সাদা-কালো লম্বা দাড়ি। পরনে সাদা পাঞ্জাবী আর গলায় মাফলার আর ফিতা জড়িয়ে কাঁচি হাতে কাপড় কেটে যাচ্ছেন অনবরত। তিনি প্রায় ৪০ বছর যাবৎ দর্জির কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তার জীবনের বেশি সময়টাই কেটেছে কাঁচি, মার্কিং চক, ফিতা, সূচ, সুতা, কাপড় আর সেলাই মেশিনের সাথেই।

তিনি রাজশাহী নগরীর নিউ মার্কেট ষষ্ঠীতলা মোড় এলাকায় এ্যাপেক্স এর শো রুমের বিপরিত পাশে ফুটপাত সংলগ্ন একটি দোকান ভাড়া নিয়ে এই দর্জির কাজ করেন। তার কাছে কোন ছিট-কাপড় না থাকলেও তিনি মূলত, পাঞ্জাবী, পাজামা, ফতুয়া, জুব্বাসহ শুধু পুরুষের ব্যাবহৃত বিভিন্ন পোশাক তৈরীর করে করেন। এই বয়সেও তিনি এ কাজ করেই দিব্যি সংসারের ঘানি টেনে চলেছেন।

সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি নগরীর চন্দ্রীমা থানাধীন ‘আলিফ লাম মীম’ ভাটার মোড় এলাকার ফিরোজাবাদ মহল্লার মৃত কালু শেখের ছেলে। তিনি পরিবারে স্ত্রীসহ দুই ছেলের সঙ্গেই থাকেন। আরো দুই ছেলে একই বাসায় থাকলেও তারা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। এক মেয়ে ছিলো সে ছোটবেলাতেই মারা যায়।

সাইফুল ইসলাম জানান, তার জন্মস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায়। পুরো ঠিকানা তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন। গ্রামের নাম পিরোজপুর শুধু এইটুকুই ভাল বলতে পারেন। সেখানে স্থানীয় বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী পযর্ন্ত পড়াশোনা করেছেন। তারপর ৬২ সালে তৎকালীন ভারতীয় সরকার মুসলীমদের উপর বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার করেন।

এ অবস্থায় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার বাবা কালু শেখ তাদের নিয়ে নিজের ভিটে-মাটি, সহায়-সম্বল ছেড়ে দিশেহারা হয়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নেন বাংলাদেশে। তারপর নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দিন মজুরীর কাজ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে থাকেন এবং পরে চায়ের দোকান দেন। স্বপ্নের পড়াশোনা করা আর হলো না সাইফুল ইসলামের। তিনি তখন বাবার সাথে সেই চায়ের দোকানে চা বিক্রি শুরু করেন। ৬ ভাই এবং তিন বোনের মধ্যে সাইফুল ইসলামই সবার বড়।

তার আরেক সাইফুল ইসলামের ভাই কাজ নেন অন্য এক দর্জির দোকানে। তাই তার ভাই দর্জির কাজ ভালোই জানেন। তার পর নিজেই খুলে বসেন এক দর্জির দোকান। সাইফুল ইসলাম মূলত তার ভাইয়ের কাছ থেকেই এ কাজ শিখেছেন এবং তার ভাইয়ের দোকানই দেখাশোনা করতেন। এক সময় তিনি এ দোকানের ভার সাইফুল ইসলামের উপরই অর্পণ করেন। তখন থেকেই তিনি এ কাজ করে আসছেন। এতে তার প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এ থেকেই তিনি জীবন সংসার পরিচালনা করে আসছেন।

এ বয়সেও তিনি দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বয়স দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। বর্তমানে তিনি আগের মতো ভালো করে আর মেশিনে সূচে সুতা লাগাতে পারেন না। এর পরেও থেমে নেই তার জীবন ও জীবিকার চাকা।

স/এমএস

আমার রাজশাহী
আমার রাজশাহী
এই বিভাগের আরো খবর