• সোমবার   ০৬ এপ্রিল ২০২০ ||

  • চৈত্র ২৩ ১৪২৬

  • || ১২ শা'বান ১৪৪১

আমার রাজশাহী
১৪৪

বছরে দেড় লাখ মানুষের অকাল মৃত্যুরোধে তামাকের কর বৃদ্ধি জরুরি

আমজাদ হোসেন শিমুল

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের জীবন প্রদ্বীপ অকালেই নিভে যাচ্ছে (সূত্র: IHME, ২০১৯)। সবুজ এই দেশটিতে মৃত্যুর এমন ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যানের জন্য তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা অনেকটা দায়ী। কার্যকর করারোপের অভাবে তামাকপণ্যের প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো তামাকজাতপণ্য সহজলভ্য হচ্ছে। ফলে দিনের পর দিন পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভবিষ্যত তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ তামাকের ভয়াল ছোঁবলে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত।

গবেষণায় দেখা গেছে, করারোপের ফলে তামাকের প্রকৃত মূল্য ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে তামাকের ব্যবহার ৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। কাজেই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধে তামাকের ব্যবহার হ্রাস করতে এবারের (২০২০-২১) বাজেটে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধি করতে হবে। এতে তরুণ, নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠি তামাকের ছোঁবল থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারের তামাকখাতে রাজস্ব আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। 

গ্লোবাল এ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে (গ্যাট্স) এর ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। এদের মধ্যে ধূমপায়ী ১৮ শতাংশ (১ কোটি ৯২ লক্ষ) এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী ২০.৬ শতাংশ (২ কোটি ২০ লক্ষ)। শহরের জনগোষ্ঠির (২৯.৯%) তুলনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠির (৩৭.১%) মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার অনেক বেশি। বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে তামাকে আসক্তি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১৩-১৫ বছর বয়সী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৯.২ শতাংশ (সূত্র: GSHS, ২০১৪)। 

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইকোনমিক কস্ট অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ : এ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। একই সময়ে  তামাকখাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয় ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের চেয়ে তামাক ব্যবহারে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। তামাকের কারণে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু যেকোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিবে। আবার এই তামাকের কারণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি আমাদেরকে পীড়া দিচ্ছে। এজন্য আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রিয় দেশের বিশাল অঙ্কের এই আর্থিক ক্ষতি ও অকাল মৃত্যুর হাত থেকে মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে।    

আমরা বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কর-কাঠামো দিকে তাকালে দেখব যে, এটি অত্যন্ত জটিল এবং তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিতকরণের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা- সিগারেটের উপর করারোপের ক্ষেত্রে বর্তমানে বহুস্তরবিশিষ্ট এডভ্যালোরেম (মূল্যের শতকরা হার) প্রথা কার্যকর রয়েছে, যা বিশ্বের মাত্র ৫/৬টি দেশে চালু আছে। একাধিক মূল্যস্তর এবং বিভিন্ন দামে তামাকপণ্য ক্রয়ের সুযোগ থাকায় তামাকের ব্যবহার হ্রাসে কর ও মূল্যপদক্ষেপ সঠিকভাবে কাজ করে না। পাশাপাশি তামাক কোম্পানিগুলোও উচ্চস্তরের সিগারেট নি¤œস্তরে ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। 

আমাদের জানা দরকার, বাজেটে করারোপের মাধ্যমে তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি জনগণের বাৎসরিক মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় (নমিন্যাল) বেড়েছে ২৫.৪ শতাংশ। অথচ এসময়ে বেশিরভাগ তামাকপণ্যের দাম হয় অপরিবর্তিত থেকেছে অথবা সামান্য পরিমাণে বেড়েছে। 

চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ট্যারিফ ভ্যালু প্রথা বাতিল করে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৩০ টাকা এবং ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ১৫ টাকা নির্ধারণ এবং উভয় ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ওজনের ভিত্তিতে খুচরা মূল্যের উপর করারোপ প্রথা চালু করায় জর্দা ও গুল থেকে কর আদায়ের জটিলতা কিছুটা কমেছে। করারোপ পদ্ধতি পরিবর্তন করায় প্রতি ১০ গ্রাম জর্দা এবং গুল থেকে সরকার ২৬ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আয় করবে। এভাবে ধোঁয়যুক্ত তামাকের তামাকের ক্ষেত্রে করাপোর পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের তথ্যমতে, পৃথিবীতে যেসব দেশে সিগারেটের মূল্য অত্যন্ত কম তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। এদেশে বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক সিগারেটের চেয়ে আরও সস্তা। ‘প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)’ রিলেটিভ ইনকাম প্রাইস পদ্ধতির মাধ্যমে সিগারেটের স্তরভিত্তিক সহজলভ্যতা বিশ্লেষণে দেখিয়েছে- ২০১৫-১৬ সালে একজন ধূমপায়ীর প্রিমিয়াম স্তরে ১০০০ শলাকা সিগারেট কিনতে যেখানে মাথাপিছু জিডিপি’র ৯.৩২ শতাংশ ব্যয় হতো সেখানে ২০১৭-১৮ সালে একই পরিমাণ সিগারেট কিনতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭.৩৪ শতাংশ। উচ্চস্তরে ১ হাজার শলাকা সিগারেট কিনতে ২০১৫-১৬ সালে মাথাপিছু জিডিপি’র ৬.৪৬ শতাংশ ব্যয় হলেও ২০১৭-১৮ সালে ব্যয় হয়েছে ৫.০৯ শতাংশ। মধ্যমস্তরে একজন ধূমপায়ীর একই পরিমাণ সিগারেট কিনতে ২০১৫-১৬ সালে মাথাপিছু জিডিপি’র ৪.১৫ শতাংশ ব্যয় হলেও ২০১৭-১৮ সালে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩.২৭ শতাংশ। 

‘গ্যাট্স’ ২০১৭ অনুযায়ী, ২০০৯ এর তুলনায় ২০১৭ সালে সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ সিগারেটের প্রকৃত মূল্য ক্রমশ হ্রাস পাওয়ায় সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এজন্য তামাকের ব্যবহার কমানোর কার্যকর উপায় সিগারেটের প্রকৃত মূল বৃদ্ধি। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে তাই তামাকপণ্যে কার্যকর ও বর্ধিত হারে করারোপ অত্যন্ত জরুরি। দেশের মানুষগুলোর অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরছি।

প্রস্তাবগুলো হলো- এক. সিগারেটের মূল্যস্তর সংখ্যা ৪টি থেকে কমিয়ে ২টিতে (নিম্ন এবং উচ্চ) নিয়ে আসা। অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে একটি মূল্যস্তর (নিম্নস্তর) এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরকে একত্রিত করে আরেকটি মূল্যস্তরে (প্রিমিয়াম স্তর) নিয়ে আসা; নিম্নস্তরে ১০ শলাকা সিগারটের খুচরা মূল্য ন্যূনতম ৬৫ টাকা নির্ধারণ করে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; প্রিমিয়াম স্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ন্যূনতম ১২৫ টাকা নির্ধারণ করে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১৯ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। 

দুই. বিড়ির ফিল্টার এবং নন-ফিল্টার মূল্য বিভাজন তুলে দেওয়া। অর্থাৎ ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৬.৮৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৩২ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৫.৪৮ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। 

আমাদের সুপারিশমালা: সকল তামাকপণ্যের উপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা হ্রাস করতে মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি করা; বিভিন্ন তামাকপণ্য ও ব্রান্ডের মধ্যে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য ব্যবধান কমিয়ে আনার মাধ্যমে তামাক ব্যবহারকারীর ব্রান্ড ও তামাকপণ্য পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করা; করারোপ প্রক্রিয়া সহজ করতে তামাকপণ্যের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন (ফিল্টার/নন ফিল্টার বিড়ি, সিগারেটের মূল্যস্তর, জর্দা ও গুলের আলাদা ট্যারিফ ভ্যালু প্রভৃতি) তুলে দেয়া; সকল ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য উৎপাদনকারীকে করজালের আওতায় নিয়ে আসা; পর্যায়ক্রমে সকল তামাকপণ্য অভিন্ন পরিমাণে (শলাকা সংখ্যা এবং ওজন) প্যাকেট/কৌটায় বাজারজাত করা; একটি সহজ এবং কার্যকর তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (৫ বছর মেয়াদি) করা, যা তামাকের ব্যবহার হ্রাস এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভ‚মিকা রাখবে; সকল প্রকার ই-সিগারেট এবং হিটেড (আইকিউওএস) তামাকপণ্যের উৎপাদন, আমদানি এবং বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা; কঠোর লাইসেন্সিং এবং ট্রেসিং ব্যবস্থাসহ তামাক কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, কর ফাঁকির জন্য শাস্তিমূলক জরিমানার ব্যবস্থা করা।

২০২০-২১ অর্থবছরের তামাক-কর প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী (১.৩ মিলিয়ন সিগারেট ধূমপায়ী এবং ১.৯ মিলিয়ন বিড়ি ধূমপায়ী) ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে; সিগারেটের ব্যবহার ১৪% থেকে হ্রাস পেয়ে প্রায় ১২.৫% এবং বিড়ির ব্যবহার ৫% থেকে হ্রাস পেয়ে ৩.৪% হবে; দীর্ঘমেয়াদে ১ মিলিয়ন বর্তমান ধূমপায়ীর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে এবং ৬ হাজার ৬৮০ কোটি থেকে ১১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার মধ্যে (জিডিপি’র ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত) অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে। 

কাজেই ২০২০-২১ অর্থ-বছরের বাজেটে তামাকজাত পণ্যের উপর কার্যকর ও বর্ধিত হারে কর আরোপের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশ গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে। ‘দাম বাড়ান তামাকের, জীবন বাঁচান আমাদের’ স্লোগানটির মধ্য দিয়ে ‘তামাকে আর খাবে না আমাকে’ কথাটির প্রতিফলিত হোক- এটি আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ম্যানেজার, ‘এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’ এবং 
সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আমার রাজশাহী
আমার রাজশাহী