• বৃহস্পতিবার   ০৯ এপ্রিল ২০২০ ||

  • চৈত্র ২৬ ১৪২৬

  • || ১৫ শা'বান ১৪৪১

আমার রাজশাহী
৩৯৭

লড়াকু হতে চেয়েছি: ভিলিয়ার্স

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

গম্ভীর গলায় সে বলেছিল। খুব মন খারাপ হয়েছিল আমার। তার বোলিংয়ের সময় একটা ক্যাচ ফেলে দিয়েছি, এ–ই ছিল আমার অপরাধ। তার বয়স ২২, আমার ১১। অতএব কথামতো ক্যাপ খুলে ফেলতে হলো, আমার প্রিয় ‘জন্টি ক্যাপ’। বাবা এই ক্যাপ কিনে দিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালের ১৭ নভেম্বর। প্রেটোরিয়ার সেঞ্চুরিয়ন পার্কে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইংল্যান্ডের প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা চলছিল। মাঠে সেদিন টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তরুণ এক ফাস্ট বোলারের, নাম শন পোলক। আর সেদিনই টেস্ট ক্রিকেটের দর্শক হিসেবে অভিষেক হয়েছিল ছোট্ট একটা ছেলের, সেই ছেলেটা আমি।

বিশেষ দিনটির স্মারক ছিল এই ক্যাপ। সবুজ রং, তার ওপর সোনালি রঙে আমার ছেলেবেলার নায়কের নাম লেখা—জন্টি রোডস। হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটা আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছিল।

‘তুমি এটার যোগ্য নও,’ বলতে বলতে আমার হাত থেকে ক্যাপটা কেড়ে নিয়েছিল গেরিট ডেইস্ট, বড় ভাই জ্যানের ২২ বছর বয়সী বন্ধু। ক্যাপটা ছুড়ে ফেলে পা মাড়িয়ে দিয়েছিল। বাগানের আবর্জনায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল আমার প্রিয় ক্যাপটা।
টের পাচ্ছিলাম, গাল বেয়ে অশ্রু নামতে শুরু করেছে।

‘কেঁদো না, কেঁদো না!’ মনে মনে চিৎকার করে নিজেকে বলছিলাম। মেজ ভাই ওয়েসেলসের বন্ধুদের সামনে আমি কিছুতেই আমার দুর্বলতা প্রকাশ করতে চাইছিলাম না। সে সময় ওরা প্রায়ই আমাদের বাড়ির উঠানে ক্রিকেট খেলতে আসত।

সত্যি বলতে আমি ঠিক খেলায় অংশ নিতাম না, খাটাখাটনি করতাম। ছোট ভাই হিসেবে বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করতাম বলেই আমাকে খেলায় নেওয়া হতো। আমার বন্ধুরা কখনো এই খেলায় ডাক পেত না। পানি আনা, ফিল্ডিং করা এবং ভাগ্য ভালো হলে দিন শেষে ব্যাটিং করা—এ–ই ছিল আমার কাজ।

‘যাও, ফিল্ডিংয়ে দাঁড়াও।’ বলেছিল গেরিট।

‘আচ্ছা, ধন্যবাদ।’ বলে আবার যখন স্কয়ার লেগে আমার জায়গা বুঝে নিলাম, তখন মাথায় জন্টি ক্যাপ নেই।

এই স্মৃতি আমার মানসপটে এত জীবন্ত, যেন এই তো গতকালেরই ঘটনা। গেরিট ডেইস্টের সঙ্গে অবশ্যই আমার এবং আমার ভাইদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। খেলার সময় এক চুলও ছাড় না দেওয়ার যে মানসিকতা আমাদের মধ্যে ছিল, এই ঘটনা তারই প্রতিফলন। সেই সময় থেকেই আমি নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার একটা তাগিদ অনুভব করতাম। শুধু খেলার যোগ্য নয়, প্রতিপক্ষের শ্রদ্ধা আদায় করে নেওয়ার যোগ্য।

আমার মতে, জোরসে বলে ব্যাট লাগানো বা ভালো ফিল্ডিং করার দক্ষতা দিয়ে শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না। শ্রদ্ধা পেতে হলে লড়াকু হতে হয়। সেটাই আমি হতে চেয়েছিলাম। প্রতিভাবান খেলোয়াড় অনেক আছে, কিন্তু সত্যিকার লড়াই করতে জানে হাতে গোনা কয়েকজন। আমি তাদের মধ্যে একজন হতে চেয়েছি।

বাড়ির উঠোনে খেলা যেই বিশেষ ম্যাচটার কথা বলছি, সেদিন আমি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা অবধি ফিল্ডিং করেছি। সূর্য যখন ডুবতে বসেছে, তখন কানে এল সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত বাক্য, ‘ঠিক আছে এবি, এবার তুমি ব্যাট করতে পারো।’

এটাই ছিল আমার সুযোগ। বোলিংয়ে ছিল গেরিট। লম্বা রান আপ নিয়ে সে ছুটতে শুরু করল। যেহেতু সারা দিন ধরে খেলা চলছে, সবার লক্ষ্য ছিল দ্রুত আমাকে আউট করা। কিন্তু আমার তো পরিকল্পনা ভিন্ন।

আমি যেসব বোলারের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের মধ্যে সেরা কে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমার সব সময় প্রথমেই গেরিট ডেইস্টের কথা মনে আসে। যদিও গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় আমি তার কথা বলি না, কারণ তাহলে আমাকে পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করতে হবে। কিন্তু এটা সত্যি। এরপর আমরা একসঙ্গে টুকিজ দলের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলেছি। নেটে যতবার আমি তার মুখোমুখি হয়েছি, ততবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

যা হোক, ডিভ পার্কের ঘটনায় ফিরি। আমার সামনে তখন অনেক বাধা। তার বয়স ২২, আমার ১১। সে দীর্ঘদেহী, জোহানেসবার্গের ক্লাব ক্রিকেট খেলা এক শক্তিশালী ফাস্ট বোলার। আমি তখনো রামবাথস প্রাইমারি স্কুলে খালি পায়ে খেলি। ২২ গজের বদলে ১৪ গজের পিচে আমরা খেলছিলাম। টেনিস বলের ওপর টেপ প্যাঁচানো হয়েছিল, যেন বলটা দুই দিকেই সুইং করতে পারে।

গেরিট আর তার বন্ধুরা আমার জন্য একটা ছাড় দিয়েছিল। আমি যেহেতু একেবারেই ছোট, ব্যাটটা আমার তুলনায় অনেক ভারী আর বড়। বোলার যখন দৌড় শুরু করে, আমি ময়লার ঝুড়িটার (যেটা স্টাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল) ওপরে ব্যাট রাখার অনুমতি পেয়েছিলাম। ডানকান ফেয়ারনলি ব্যাটটা আমাকে দিয়েছিল ওয়েসেলস। যেহেতু আকারে অনেক বড়, পেছনের পায়ে ভর দিয়ে আমাকে শট খেলতে হচ্ছিল। সেই খেলা ২০ বছর পরের আমার ব্যাটিংয়ের কৌশলে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আমি তৈরি ছিলাম। দৃষ্টি ছিল এক দিকে। নিজেকে বলছিলাম, মনোযোগ দাও। লাইনে থাকো। লড়াই করো। হাল ছেড়ো না। শর্ট বল হোক বা বাইরের বল, খেলো। আর যা-ই করো, যে তোমার ক্যাপ পায়ে মাড়িয়েছে, তাঁর বলে আউট হোয়ো না।

গেরিট একের পর এক বল ছুড়েছে, আমাকে আউট করতে পারেনি। এরপর বোলিংয়ে এসেছে আমার ভাই জ্যান। তাঁর বোলিংয়ের সময় ফিল্ডাররা আমাকে চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরেছে, তবু কাজ হয়নি। দেখিয়ে দিতে চাইছিলাম, আমি ওই ক্যাপ পরার যোগ্য।
ওরা একসময় স্লেজিং করা শুরু করল। কানে তুলিনি। একপর্যায়ে আমি যখন রানের জন্য ছুটছিলাম, একজন আমার পথ আগলে দাঁড়াল। ‘এটা ঠিক না।’ প্রতিবাদ করলাম আমি, ‘আমি মা-বাবাকে বলে দেব।’

জবাব এল, ‘যাও বলো। আর কোনো দিন তোমাকে খেলায় নেব না।’

যত যা-ই হোক, মাঠ ছাড়িনি। লড়াই করে গেছি, খেলার প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করেছি, প্রতিটা বল খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছি। শেষে জ্যান ভাবল, অনেক হয়েছে। সে এবার বল মারল আমার পিঠ বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে কান্না শুরু করলাম। রান্নাঘর থেকে মা ছুটে এলেন বলে খেলা সেদিনের মতো শেষ করতে হলো।

ক্যাপটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার মাথায় দিয়েছিলাম। আমি তখন আবেগ আর রোমাঞ্চে টইটম্বুর, বড়রা কখন চলে গেছে, খেয়ালও করিনি। মনে হচ্ছিল আমি এই খেলার যোগ্য, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

আমার রাজশাহী
আমার রাজশাহী
খেলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর